📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৭:২৮ পিএম  (ভিজিটর : )

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যখন পুশইন ইস্যুতে টানাপোড়েন ও উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। গত শুক্রবার বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দিনেশ ত্রিবেদী পেশাদার কূটনীতিক নন; তিনি ভারতের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। গত এপ্রিলে ভারত সরকার তাকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো হলো।

বাংলাদেশে এসে তিনি বলেন, দুই দেশের মানুষকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। অভিন্ন আকাশ, অভিন্ন বাতাস এবং বহু ক্ষেত্রে অভিন্ন স্বার্থ ও চ্যালেঞ্জ আমাদের একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ভিসা জটিলতাসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান পারস্পরিক আস্থা ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্কই তার প্রধান অগ্রাধিকার।

দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঢাকায় পাঠানোর মাধ্যমে ভারত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে-বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তারা আগ্রহী। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেরও উচিত বাস্তববাদী ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।

সীমান্তে উত্তেজনা, পুশইন কিংবা মানুষ হত্যার মতো ঘটনা কখনোই সুস্থ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের প্রতীক হতে পারে না। এসব ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান অস্বস্তি ও অবিশ্বাসের প্রতিফলন। অথচ বর্তমান বিশ্বে সংঘাত নয়, সংলাপই সংকট সমাধানের কার্যকর পথ। তাই পুশইনসহ সব অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা জরুরি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্তে অস্থিরতা শুধু দুই দেশের নিরাপত্তার জন্য নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উভয় দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।

শুধু সীমান্ত নয়, দুই দেশের মধ্যে আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, ভিসা জটিলতা, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা এবং যোগাযোগসংক্রান্ত নানা সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। এসব বিষয়ে নিয়মিত ও ফলপ্রসূ সংলাপই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।

একটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না; তাই মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজাই বুদ্ধিমানের কাজ।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রোথিত। সেই ঐতিহাসিক বন্ধন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম শক্তি। বাস্তবতা হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু সেই মতভেদকে সংঘাতে নয়, সংলাপে রূপান্তরিত করাই দায়িত্বশীল কূটনীতির পরিচয়।

ভারতের নতুন হাইকমিশনারের আগমন দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও আস্থার পরিবেশ তৈরির সুযোগ এনে দিয়েছে। উভয় দেশেরই উচিত সেই সুযোগকে কাজে লাগানো।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জগুলোও নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে কোনো দেশের পক্ষে এককভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অর্থনীতি, বাণিজ্য, শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, জলবায়ু ও নিরাপত্তা-সব ক্ষেত্রেই কার্যকর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অপরিহার্য।

আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করা। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যবাহী নীতিকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করতে হবে।

আমরা আশা করি, পারস্পরিক সম্মান, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনীতি আবারও সঠিক পথ খুঁজে পাবে।

অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার
আরো দেখুন

Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news@dailyobserverbd.com, advertisement@dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd@gmail.com
🔝