📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
তারেক রহমানের প্রথম বাজেট: উন্নয়ন, মানবসম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার নতুন পথচলা
✎ সিরাজুল ইসলাম
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ৮:৫০ পিএম  (ভিজিটর : )

একটি বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। একটি বাজেট আসলে একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। সে কারণেই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ জনগণ তখন শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে না; তারা খুঁজে দেখে সরকার কোন দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার কেবল প্রবৃদ্ধির কথা বলেনি বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে।

অনেক সময় আমরা উন্নয়ন বলতে শুধু বড় বড় সেতু, মহাসড়ক কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা হলো- উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি মানুষ। দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। এবারের বাজেটে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই এটি অনেকের কাছে জনবান্ধব বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। বিশ্বের যে দেশগুলো দ্রুত উন্নতি করেছে, তাদের প্রায় সবকটিই শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, মানবসম্পদে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে সেটিই আবার বোঝায় পরিণত হতে পারে।

সেই কারণে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেবল সনদ নয়, প্রয়োজন দক্ষতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণার ওপর জোর না দিলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই শিক্ষাখাতে বাড়তি মনোযোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বও নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। করোনা মহামারির পর পুরো বিশ্ব বুঝেছে, স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করলে তার মূল্য অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবাইকে দিতে হয়। একজন অসুস্থ নাগরিক যেমন উৎপাদনশীল হতে পারেন না, তেমনি একটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসক সংকট দূর করা, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সময়ের দাবি। বাজেটে এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই সাধারণ মানুষ আশাবাদী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে আমার দৃষ্টিতে এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই চলে না; তাকে নিরাপদও হতে হয়। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ধরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার হামলা, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষ সশস্ত্র বাহিনী শুধু যুদ্ধের জন্য নয়; দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সামরিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

এবারের বাজেটের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বারোপ। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে না নিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দরিদ্র, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তাই রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের অংশ।

এছাড়া, কৃষি খাতের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতই শিল্প ও সেবাখাতনির্ভর হোক, কৃষির গুরুত্ব কখনো কমবে না। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষির বিকল্প নেই। কৃষক যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসা সহজীকরণ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে এই শিক্ষিত তরুণ সমাজ সমাজের বোঝা হয়ে উঠবে। তাতে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, নানারকম অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিরও আশংকা থাকে।

বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে এই বাজেটের অন্যতম বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।

তবে বাজেট যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নই শেষ কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সময় দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারের আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। বরাদ্দ ঘোষণা করলেই হবে না; তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়- শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ফলে বিদ্যালয়ের মান কতটা বাড়ল, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ফলে চিকিৎসাসেবা কতটা উন্নত হলো, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তাদের জীবনে কতটা পৌঁছালো।

সুতরাং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি উন্নয়ন দর্শন এবং একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে সরকার যে বার্তা দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

এখন অপেক্ষা একটাই- ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কতটা কমানো যায়। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বাজেটের অঙ্ককে নয় বরং তার ফলাফলকেই মনে রাখে। যদি এই বাজেটের লক্ষ্যসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি অর্থবছরের পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
আরো দেখুন

Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news@dailyobserverbd.com, advertisement@dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd@gmail.com
🔝