জীবনের তাগিদে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় যারা নাড়ির টান ছিঁড়ে দূর প্রবাসে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কাছে ঈদ অনেক সময়ই আনন্দের নয়, বরং এক গভীর শূন্যতার নাম। দেশের মানুষ যখন নতুন পোশাক, আত্মীয়-স্বজন আর আনন্দ আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত, তখন প্রবাসীরা ডুবে থাকেন কর্মব্যস্ততার মাঝে।
প্রবাসে ঈদের সকালটা শুরু হয় একেবারেই ভিন্নভাবে। সেখানে নেই মায়ের হাতের সেমাইয়ের ঘ্রাণ, নেই পরিবারের কোলাহল কিংবা আপনজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ। অনেকেই ছোট্ট মোবাইল স্ক্রিনে ভিডিও কলে পরিবারের হাসিমুখ দেখে ক্ষণিকের স্বস্তি খুঁজে নেন। তবে সেই হাসির আড়ালেও জমে থাকে না বলা কষ্টের পাহাড়।
বিশেষ করে বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় অনেক প্রবাসীর চোখ ভিজে ওঠে। ফোনের ওপার থেকে মা যখন জানতে চান, “বাবা, কী খেয়েছিস?”, তখন বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে। নিজের কষ্ট লুকিয়ে, গলা সামলে অনেকেই উত্তর দেন—“মা, খুব ভালো আছি। বন্ধুদের সঙ্গে অনেক আয়োজন করেছি।”
বাস্তবে হয়তো সেই আয়োজনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় একাকীত্ব, স্মৃতি আর প্রিয়জনদের কাছে না থাকার যন্ত্রণা। তাই প্রবাসীদের ঈদ অনেক সময় উৎসবের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে ত্যাগ, ভালোবাসা আর নীরব অশ্রুর গল্প।
যে মানুষটি দেশে থাকতে নিজের থালাটি পর্যন্ত গুছিয়ে রাখতেন না, তাকেই হয়তো ঈদের সকালে বড় ডেকচিতে মাংস কষাতে হয়। কিন্তু সেই মাংসের ঝোলে যখন মায়ের হাতের সেই চিরচেনা স্বাদ পাওয়া যায় না, তখনই বুকটা হু হু করে ওঠে। চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসলেও মা, স্ত্রী কিংবা সন্তানের অনুপস্থিতিটা পাথরের মতো ভারী হয়ে থাকে। মনে মনে ভাবেন ‘ইশ!’ এই মাংসের টুকরোটা যদি আজ নিজের সন্তানের মুখে তুলে দিতে পারতাম!
প্রবাসীরা হলেন সেই জাদুকর, যারা নিজের পকেটে শূন্যতা নিয়েও দেশের মানুষের পকেট পূর্ণ রাখেন। ওভারটাইম করা টাকায় বোন নতুন শাড়ি কেনে, ভাই কেনে পছন্দের বাইক। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনারও প্রয়োজন বোধ করেন না তারা। ঈদের বিকেলে যখন পার্কের কোনো বেঞ্চে একাকী বসে থাকেন, তখন কেবলই মনে পড়ে; বাবার হাত ধরে ছোটবেলায় ঈদগাহে যাওয়ার সেই রঙিন স্মৃতিগুলো।
বিদেশের ঈদের কোনো রঙ নেই, কোনো ঘ্রাণ নেই। এখানে আছে শুধু দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরা আর পরের দিনের কাজের চিন্তা। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে প্রবাসী মানুষটি হয়তো ভাবেন, আর কতকাল? আর কতগুলো ঈদ এভাবে একা একা কাটবে? নিজের সবটুকু সুখ দেশে পাঠিয়ে দিয়ে বুকের ভেতর একখণ্ড মরুভূমি নিয়ে বেঁচে থাকার নামই যেন প্রবাসের ঈদ।