পটুয়াখালীর দশমিনায় তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীর মাঝের দুর্গম চরগুলোতে গড়ে ওঠেছে মহিষের বাথান। এসব চরাঞ্চলে চড়ে বেড়ায় কয়েক হাজার মহিষ। মহিষগুলো রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে রাখাল। বিস্তীর্ণ একেকটি চরের বিশাল এলাকাজুড়ে তৃণভূমিতে মানুষ (রাখাল) ও পশুর জীবন পুরোপুরি নির্ভরশীল নদীর জোয়ার ভাটার ওপর। দিন কিংবা রাতের বিচারে নয়, নদীর জোয়ার-ভাটার নিয়মেই পরিচালিত হয় মহিষ ও মানুষের জীবন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরগুলোর তৃণভূমিতে রাখালেরা খোলা আকাশের নীচে মহিষগুলোকে লালন-পালন করছেন। বাথানের পাশেই নদী ঘেঁষা বালুচরে রাখালেরা ছোট ছোট ঘর তুলে থাকেন। মহিষগুলো লালন-পালন করাই তাদের কাজ। মহিষের সাথেই যেনো ঘর-সংসার তাদের। মহিষ পালনকে ঘিরে চলছে তাদের জীবন জীবিকা। দুর্গম এই চরাঞ্চলগুলোর চতুর্দিকেই রয়েছে নদী। নদীর পানিতেই মহিষের পালের মতো গোসল ও তৃষ্ণা মেটায় রাখালরা।
চর হাদীর রাখাল আবুল বশার বলেন, 'দিন-রাতের নিয়মে মহিষ বিচরণ করেনা। রাখালদেরও দিন-রাত নেই। চরের মানুষ ও পশুদের সবটাই চলে জোয়ার ভাটার নিয়মে। জোয়ারের সময় মহিষগুলো চরের অপেক্ষাকৃত উঁচু তৃণভূমিতে বিচরণ করে। আবার তীব্র গরমে ভাটার সময় নদীতে নেমে দেহ পানিতে ডুবিয়ে মাথা জাগিয়ে রাখে। বিশাল চরের তৃণভূমিতে তারা ঘাস খায়।'
লালচর এলাকার রাখাল শাহজাহান বলেন, 'এসব চরে প্রায়শই ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উচ্চ জোয়ার আঘাত হানে।'
জানা যায়, অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সময় মাঝে মধ্যে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। বেড়িবাঁধবিহীন এসব চরাঞ্চলের মূল প্রতিবন্ধকতা হলো ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ার। বর্ষা মৌসুমে চরের তৃণভূমিও প্লাবিত হয়। তখন এসব চরে মহিষ রাখা যায়না।'
এসব চরাঞ্চলে বাঁশ, কাঠ, টিন, পলিথিন ও ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী আবাস বানানো হয়। প্রতিকূল পরিবেশে এখানে মহিষ আশ্রয় নেয়। আর বিস্তীর্ণ চরের তৃণভূমিতে ‘বাথানে’ বিচরণ করে ও খাবার খায়। চরে মহিষের জীবন অনেকটা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। এখানকার রাখালদের জীবন অনেকটা যাযাবরের মতো। মাঝে মধ্যে তারা মহিষের পিঠে চড়ে বাঁশি বাজিয়ে বা গান গেয়ে সময় কাটায়।
জানা যায়, ভোর থেকে শুরু হয় রাখালদের কর্মযজ্ঞ। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষ করেই চলে তাদের কাজ। মহিষের দুধ দোহানো, নৌকায় করে পাইকারি ক্রেতাদের কাছে দুধ পাঠানো আর দুপুর পর্যন্ত মহিষগুলোকে মাঠে চড়ানো শেষে মধ্যাহ্নভোজ। বিকেলে আবারও মহিষ চড়ানো। এ যেনো প্রাকৃতিক শিল্প প্রতিষ্ঠান। রাখালের দোহনে মহিষ থেকে উৎপাদন হচ্ছে দুধ। একটি মা মহিষ দিনে দু’বারে গড়ে তিন থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত দুধ দেয়। প্রতি লিটার দুধ একশো থেকে শুরু করে দেড়শো টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
রাখালরা জানান, তারা একেকজনে প্রায় ৩০ থেকে ৫০টি মহিষ লালন-পালন করেন। রোদ, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করেন তারা। মহিষের সঙ্গে তাদের দিন-রাত কাটে। রোগ-শোকের মধ্যেও তাদের এসব দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। রাতে নৌকার ছাউনির মতো ছোট ছোট ছাউনিতে তারা অবস্থান করে। কেউ কেউ তীরে নোঙর করা ছোট ডিঙ্গি নৌকার ছাউনীর নীচে রাত কাটায়। চোরের ভয়ে অনেক সময় সারা রাত জেগে পাহাড়া দিতে হয়।
তারা জানান, কয়েকশো মহিষের পালের মধ্য থেকে নিজের মহিষগুলো চিনতে অসুবিধা হয় না কোনো রাখালের। প্রত্যেকে নিজের ও সবার মহিষগুলো চেনে। শুধু চোরের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয়।
মহিষের মালিক খলিল সিকদার বলেন, 'এলাকায় এই সময়ে পর্যাপ্ত ঘাস না থাকায় মহিষগুলো চরে নিয়ে এসেছি। শুকনো মৌসুমে প্রায় ৫/৬ মাস এসব চরে মহিষগুলো পালন করা হয়। একেকজন রাখালের বেতন প্রায় ২১ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এছাড়াও তিন বেলা খাবারসহ অন্যান্য খরচ দিতে হয়। বর্ষা মৌসুমে মহিষগুলো নিয়ে আমরা যার যার এলাকায় ফিরে চলে যাই।'
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন দশমিনা উপজেলা শাখার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট তপন কুমার দেবনাথ ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'দুর্গম চরাঞ্চলে এসব মহিষগুলোকে সুলভ মূল্যে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি রাখালদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।'
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শুভেন্দু সরকার ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'চরাঞ্চলের প্রাণী চিকিৎসায় আমাদের একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এআই টেকনিশিয়ান রয়েছেন। তিনি প্রাণী রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন আমাদের সহায়তা নিয়ে। সীমিত জনবল থাকা সত্ত্বেও উপজেলার দূর্গম চরাঞ্চলের জন্য আমাদের ওই একজন এআই টেকশিয়ান আশার আলো হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।'
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka. E-mail: district@dailyobserverbd.com, news@dailyobserverbd.com, advertisement@dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd@gmail.com