জাতীয় বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। এমন এক সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারিখাতকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। একইসঙ্গে শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর হ্রাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা এবং সহজ ঋণপ্রাপ্তির উদ্যোগ ব্যবসাবান্ধব বার্তা বহন করে।
তবে শুধু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো নীতিগত স্থিতিশীলতা, আইনের সুষম প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক পূর্বানুমেয়তা। কোনো অর্থনীতিতে আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন উদ্যোক্তারা নিশ্চিত থাকেন যে তাদের বিনিয়োগ, ব্যবসা পরিচালনা এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার অভিযোগ করে আসছেন।
নতুন বাজেটে লাইসেন্স, নিবন্ধন ও বিভিন্ন অনুমোদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের ধারণা প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, নীতিগত ঘোষণা এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে প্রায়ই বড় ব্যবধান থেকে যায়। তাই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। বিনিয়োগকারীরা শুধু নীতির ঘোষণা নয়, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং পূর্বানুমেয় ব্যবসায়িক পরিবেশ অপরিহার্য।
একইসঙ্গে ব্যাংকিংখাতে শৃঙ্খলা, পুঁজিবাজারে আস্থা এবং দ্রুত সেবা প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও বেসরকারিখাতকে প্রতিপক্ষ নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করাই হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বাজেটে ঘোষিত কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রয়োজন আস্থা, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রকৃত পরীক্ষা হবে সেখানেই।
এমএ